‘করোনা’ নিয়ে রাজনীতি করোনা!

শফিকুল ইসলাম খোকন: আমরা কথায় কথায় বলি, এখানেও রাজনীতি? ওখানেও রাজনীতি? হ্যাঁ কথাটি একেবারেই সঠিক কারণ এখন সবক্ষেত্রেই রাজনীতি বিরাজ করছে। সেখানে ভালো আর মন্দ যাচাই নয়; কোন কিছু হলেই সেখানে রাজনীতি কি জাতীয় পর্যায়, কি স্থানীয় পর্যায়। উদাহরণ হিসেবে যদি বলিণ্ড এক এলাকায় ফুটবল খেলা নিয়ে দুই পক্ষের সাথে মারামারি হলো, এক পর্যায় ওই বিরোধটি রাজনীতিতে চলে যায়। শেষমেশ দলীয় করণের কারণে মামলা পর্যন্ত গড়ায়। এতো হলো একটি গ্রামের কথা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোন ইস্যূ হলে সেটিও রাজনৈতিক পর্যায় নিয়ে যাওয়া হয়। আমি বিশ্বাস করি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোন ঘটনা দুর্ঘটনা রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হয়। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যা কিছু ঘটুক, মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। আর এবার করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে চীন থেকে, যে চীন থেকে এখন বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রে পৌছে গেছে। সবশেষ বাংলাদেশেও ঢুকে পড়েছে।

সম্প্রতি করোনা নিয়ে দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে আতঙ্কিত এবং মৃত্যূর ঘটনা ঘটেছে। যার প্রভাব বাংলাদেশে না পড়লেও মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনার প্রভাব পড়ে। গত তিন চারদিন ধরে বাংলাদেশে করোনার রোগ ধরা পড়ে, যদিও তা ইতালি প্রবাসি। দেশের বাইরে প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা ভাইরাসে (কভিড-১৯) মৃতের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী চার হাজার ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার ৭৩৯ জনে। ২০০৩ সালে পৃথিবীতে আতঙ্ক তৈরি করেছিল সার্স। চীন থেকে উদ্ভূত হয়েছিল সার্স। ওই রোগে ৮ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, মারা গিয়েছিল ৭৭৪ জন। সেই সময়ে বৈশ্বিক জিডিপির ৪ শতাংশ আসত চীন থেকে। তখনই বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্তত ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ক্ষতি হয় বলে অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছিলেন। আর গতবছর বৈশ্বিক জিডিপিতে চীনের অবদান ছিল ১৬ শতাংশ। সুতরাং সার্সের তুলনায় বিশ্ব অর্থনীতিতে করোনা ভাইরাসের প্রভাব হবে আরো বিধ্বংসী। বিশ্ব অর্থনীতির জন্য করোনা ভাইরাস ইতিমধ্যে মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এটি চীন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থা- যা হবে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার পর সর্বনিম্ন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি। বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার শঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, চীনের করোনা ভাইরাস বৈশ্বিক অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এতে পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পর্যটন খাতেও প্রভাব পড়ছে। করোনার কারণে মৃতের পাশাপাশি সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে যেমন বিশাল ধাক্কা লেগেছে তার পাশাপাশি বাংলাদেশী অর্থনীতিতে এর প্রভাব কম পড়ছো। এরই মধ্যে দেশের অন্তত ১৪টি খাতে সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমদানি-রফতানি সংকুচিত হওয়ায় কয়েকটি খাতে অন্তত ৬০০০ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ১৪টি খাত করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মধ্যে প্রতিবেদনে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজ, প্রসাধন, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট সুতা, মুদ্রণ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চশমা, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য, কাঁকড়া ও কুঁচে এবং প্লাস্টিক শিল্পসহ মোট ১৩ খাতের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আমরা জানি বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এ দেশের রক্ষক, নীতি নির্ধারক কিংবা পরিচালনার দায়িত্বও রাজনীতিবদের তথা রাজনৈতিক দলের। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী দলই দেশের সরকারের দায়িত্ব নেয়। আর সেই সরকারের বিভিন্ন ভুলত্র“টি ধরিয়ে দেয়া বা গঠনমুলক সমালোচনা করার দায়িত্ব বিরোধী দলের। কিন্তু সব বিষয় আবার রাজনীতি টেনে আনাটাও উচিত নয়। রাজনীতিতে বা রাজনীতিবিদদের মুখে এমন কিছু কথা প্রকাশ পায় যা তাদের মুখে একেবারেই অনুচিত। এমন নোংরা কথা রাজনীতিবদদের মুখে আমরা শুনতে পাই। আমার মনে পরে কয়েক বছর আগে সংবিধান সংশোধন নিয়ে আ.লীগ ও বিএনপির তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। তখন বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী শেখহাসিনাকে উদ্দেশ্যে করে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা বোরখা পড়ে প্রেমপ্রেম খেলোনা’।

ওই সময়কালে বিরোধী দল বিএনপির এক নেতা বলেছিলেন, বিএনপির দাবি না মানলে বিএনপির সকল সংসদ সদস্যরা গণপদত্যাগ করবে। তখন তার কথায় পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে প্রয়াত আ.লীগর নেতা সুরঞ্জিন সেনগুপ্ত বলেছিলেনণ্ড ‘বিএনপির এমপিরা মলত্যাগ ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেনা’। আমাদের রাজনীতিবিদদের মুখে এ রকমের কথাও শুনতে হয়েছে। তখন আমি ‘রাজনীতিবিদদের সংশোধন হওয়া প্রয়োজন’ শিরোনামে একটি উপ সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। যা জাতীয় অনেক দৈনিকেই প্রকাশিত হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করবেন রাজনীতিকরা বা রাজনৈতিক দল। সেই রাজনীতিবদের কথা বা আচরণ হওয়া উচিত খুবই সুন্দর সাবলিল। যা দেশের নাগরিকরা অনুসরণ করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারেণ্ড ধানের মাজরা বা রিপু প্রতিহত করতে হলে নিয়মতান্ত্রিক কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে। আর ওই কীটনাশক যদি হয় ভেজাল তাহলে ধানের মাজরা পোকা দমনতো হবেই না বরং ধানই নষ্ট হয়ে যাবে। তেমনি যাদের দ্বারা দেশ পরিচালিত হয় তাদের অবশ্যই ভেজালমুক্ত, দুর্ণীতিমুক্ত হতে হবে, হতে হবে সুন্দর আচরণের মুখপাত্র।

বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে চলছে একটি আতঙ্ক যার নাম করোনা। আমরা মিডিয়ার মাধ্যমে দেখেছি দেশের বাইরে করোনার অবস্থা। সেসব রাষ্ট্রতো পরিচালিত হয় কোন না কোন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে? সেখানেও তো দেখা যায়নি করোনা নিয়ে রাজনীতি? করোনা নিয়ে অগণতান্ত্রিক, অগঠণতান্ত্রিক বক্তব্য। বিরোধী দলের প্রতি সরকারি দল অথবা সরকারি দলের প্রতি বিরোধী দলের নোংরা বক্তব্য? কিন্তু বাংলাদেশে করোনা আসতে না আসতেই সমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। করোনা নিয়েও রাজনীতি! হ্যাঁণ্ড রাজনৈতিক দলের কাজই হচ্ছে গঠনমুলক সমালোচনা করা কিংবা সরকারি দলের ভুল ত্র“তি তুলে ধরা। অথবা দেশের কোন সমস্যা হলে রাজনৈতিকভাবেই সমামান করা। কিন্তু যেখানে করোনা আন্তর্জাতিক ইস্যু, প্রাণঘাতি করোনায় অনেক লোক মারা যাচ্ছে সেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিহত বা এ থেকে বাঁচার উপায় খুঁজে বের না করে সমালোচনা শুরু করে দেয়া হয়েছে। ইতোধ্যেই আ.লীগের প্রতি বিএনপি আর বিএনপির প্রতি আ.লীগের করোনা ইস্যূ নিয়ে পাল্টা বক্তব্য শুরু হয়ে গেছে। এটি সত্যিকার অর্থে কাঙ্খিত নয়;

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে জনসচেতনতা নিশ্চিত করার জন্য মিডিয়াসহ সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে তরিৎ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন ছিল, তাও নেয়া হয়নি। মুজিববর্ষ পালনের ডামাডোলে জনস্বার্থ অবহেলা করে সরকার দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।’ এ ব্যাপারে সরকারের ব্যর্থতা জনগণ কখনও ক্ষমা করবে না। জনগণ ’৭৪ এর মত আরেকবার গণমৃত্যুর শিকার হতে চায় না।’ করোনাভাইরাসের মতো কোনো সংবেদনশীল ও মানবিক ইস্যু নিয়ে রাজনীতি না করতে বিএনপির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ওবায়দুল কাদের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে বলেন, ‘দেশে করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পরে এপ্রিল পর্যন্ত সব ধরনের বৈঠক, জনসভা ও আলোচনা সভা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ।’

আমি মনে করি; এই করোনা বলেন আর সার্স, নিপাহ, জিকা এ সবই প্রকৃতির প্রতিশোধ। প্রকৃতির বিকৃতির ফল। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করা যায়না, তবে করোনার মতো প্রাণঘাতি রোগ প্রতিরোধের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তা অনেক উপায় দিয়ে রেখেছেন। তবে আমি এসব রোগ নিয়ে চিন্তিত হলেও হতাশ নই। কিন্তু করোনা নিয়ে করোনার মতো রোগ নিয়ে রাজনীতি আমাকে হতভাগ বা হতাশ করে দিয়েছে। যেখানে প্রাণঘাতি করোনা নিয়ে সারাবিশ্ব আতঙ্কিত, যার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা বন্ধ প্রায় পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও বিশাল ধাক্কা সেখানে আমাদের রাজনীতিবিদরা করোনা প্রতিহত করার জন্য কোন উপায়ের পথ অবল¤¦ন না করে রাজনীতি শুরু করে দিয়েছে। করোনা নিয়ে রাজনীতি করোনা! এটি ভালো লক্ষ নয়। তাই আসুন শুধু করোনা কেন? রাজনীতিতে এরকমের প্রতিহিংসা পরায়নের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করোনা থেকে মুক্ত হতে হবে, দেশকে এগিয়ে নিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। মুজিব বর্ষে এটি হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক

পিবিএ/বিএইচ

আরও পড়ুন...