কোন সভ্যতায় আমরা!


শফিকুল ইসলাম খোকন: সুকান্ত ভট্টাচার্যের বোধন কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে এ লেখাটি শুরু করতে হলো কারণ কবিতার এই কয়েক লাইনের সাথে হয়তো এ সমাজের কিছু ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। কবিতাটির লাইন হলো ‘হে মহামানব, একবার এসো ফিরে শুধু একবার চোখ মেলো এই গ্রাম নগরের ভিড়ে, এখানে মৃত্যু হানা দেয় বারবার; লোকচক্ষুর আড়ালে এখানে জমেছে অন্ধকার।’ বর্তমান সময়ের একটি বড় প্রশ্ন, মানুষ কেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে? এই মানুষ যে শুধু অশিক্ষিত বা অভব্য গোষ্ঠীর তা নয়, শিক্ষিত ও সভ্য গোষ্ঠীর মানুষরাও এখন কী অবলীলায় অস্বাভাবিক ও কুৎসিত আচরণ করে ফেলছেন। তাই সচেতন মানুষের মনে প্রশ্ন, এ কোন সভ্যতায় আমরা?

বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার নির্মম হত্যা নিয়ে যখন সারাদেশে তোলপাড়া, দেশের গণমাধ্যমসহ বিদেশি গণমাধ্যমে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, আবরারের ঘটনা যেতে না যেতেই ১৪ অক্টোবর সোমবার ঘটে গেল আরেক নির্মম ঘটনা, ৫ বছরের তুহিন নামে এক শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পেটে একটি নয়, বরং দুটি ছুরি ঢুকিয়ে হত্যা করা হয়েছে তুহিন নামে এক শিশুকে। বর্বরতার এখানেই শেষ নয়। তার দুই কান ও যৌনাঙ্গও কেটে নেওয়া হয়েছে। পরে পাঁচ বছর বয়সী ওই শিশুর নিথর দেহ ঝুলিয়ে রাখা হয় কদম গাছের ডালে। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামে।

একটু চোখ বুঝে বা ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন, যদি আপনার কোন সন্তান বা ভাই অথবা নিকটতম আত্মীয় ৫ বছরের শিশুকে গলা কেটে, কান কেটে, পেটে দুই ছুড়ি ঢুকিয়ে এবং পুরাষাঙ্গ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে তাহলে কেমন লাগবে? ভাবতে পারেন? একটু ভেবে দেখুনতো…। সুস্থ্য মস্তিস্কের কোন মানুষ আমার মনে হয় এটি সহ্য করতে পারবে না। তুহিনের ঘটনা দেখা মাত্র আমার ফেসবুকে ওয়ালে ছবিসহ ষ্টাটাস দিয়েছিলাম। তখন আমার অনেক সাংবাদিক বন্ধু এবং ফেসবুক বন্ধুরা কমেন্ট বক্সে লিখেছেন এটি সহ্য করা যায়না, এ ছবিটি দেয়া ঠিক হয়নি। আমি বিশ্বাস করি এ ছবিটি পোষ্ট করা ঠিক হয়নি, কিন্তু যে ঘটনা ঘটছে সেটি কি সহ্য করতে পারবে কেউ? না পারবেনা। সহ্য করা যাবেও না।

কি ঘটেছিল ওইদিন? কি কারণে নির্মমভাবে হত্যা হয়েছিল তুহিনকে? কেনইবা তার পিতাণ্ডমাতাকে সন্তান হারা করা হলো, কি অপরাধ ছিল ওর…? এ প্রশ্ন শুধু আমার নয়; গোটা জাতির। হত্যা করেই প্রতিহিংসা,ক্ষোভ আর রাগ শেষ হয়ে যায়? না… আমি বিশ্বাস করিনা। একজনের প্রতি ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা থাকলে তাকে হত্যা করলেই শেষ হয়ে যায়না। বরং এ থেকে আরও তিক্ততা, শত্রুতা বাড়ে। ক্রমশ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে বা পড়তে হয়। তুহিনের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রোববার দিনগত রাতে ঘুম ভাঙলে দেখা যায় ঘরের দরজা খোলা এবং বিছানায় তুহিন নেই। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ভোরে বাড়ির পাশের একটি গাছে কান, লিঙ্গ ও গলাকাটা অবস্থায় তুহিনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রাতে কৌশলে শিশুটিকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা। হত্যায় ব্যবহৃত দু’টি ছুরি তার পেটের মধ্যে গেঁথে রেখেও যায় পাষন্ড হত্যাকারীরা।

পুলিশের ভাষ্যমতে তাদের দীর্ঘসময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সন্ধ্যায় তাদের মধ্যে কয়েকজন এ হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার ইঙ্গিত দেন। সন্দেহ করা হচ্ছে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে এ হত্যাকান্ড ঘটনো হয়েছে। আরও অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে সব কিছু বের করা হবে। তদন্তের স্বার্থে এর বেশি কিছু বলা যাবে না। জানা যায়, তুহিনের পেটে যে দু’টি ছুরি বিদ্ধ ছিল, তার বাটে কলম দিয়ে একই গ্রামের বাসিন্দা ছালাতুল ও সোলেমানের নাম লেখা দেখা যায়। এ দু’জন তুহিনের বাবা আব্দুল বাছিরের প্রতিপক্ষ সাবেক মেম্বার আনোয়ার হোসেনের লোক বলে পরিচিত। হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরির মধ্যে কীভাবে নাম লেখা হয়েছে বা কারা এটি সাজিয়েছে তা-ও তদন্ত করা হচ্ছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, তদন্ত শেষ হলে সাংবাদিকদের সবকিছু বলা হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঘটনা কাউকে ফাঁসানোর জন্য করুক অথবা প্রতিহিংসা পরায়ন হয়ে করুক কাজটি কি ঠিক হয়েছে? প্রতিহিংসা আর ফাঁসানোর জন্য কি এ পথ অবল¤¦ন না করলে হতো না?

এটা কি সভ্যতা…? না অন্য কোন অন্য কিছু, এটা সভ্যতা বলা যাবেনা। আসলে আমরা কোন সভ্য সমাজে বাস করছি। তুহিন নামে ৫ বছরের এ শিশুর কি অপরাধ ছিল? না ওর পিতা ও মাতা অথবা আত্মীয় ও স¦জনদের সাথে দ্বন্ধ বা বিরোধ ছিল? যতই বিরোধ থাকুক অথবা ৫ বছরের অবুঝ শিশুর যত বড়ই অন্যায় থাকুক এর এটাই কি পরিনাম? না এটি হতে পারেনা। যেমনটি হয়নি আবরারের বেলায়। ধিক্কার… এ রকমের সমাজের, ধিক্কার এ রকমের মনুষত্বের, ধিক্কার জানাই এ রকমের পাষন্ড মানসিকতাকে। বিচার কি হবে? আমি মনে করি, এ রকমের ঘটনার পুর্বে সামাজিক অপরাধ প্রতিহত করা উচিত। এ রকমে অপরাধ সমাজে হয়ে থাকে, তেমনি এ রকমের সামাজিক অপরাধ সামাজিকভাবেই প্রতিহত করতে হবে। আমি মনে করি সব বিচার আইন দিয়ে করা যায়না বা সব অপরাধ আইনের চোখেও দেখা যায়না। এসব অপরাধ সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে এবং এ রকমের অপরাধ সমাজের মানুষদেরই ঘটনা পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে। সরকারের একার পক্ষে বা আইন দিয়ে সকল অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।

এমন নির্মমতা যুগযুগ ধরে ঘটে চলেছে। কিন্তু তুহিনের মতো ঘটনা…। আমার বয়সে এই প্রথম দেখেছি এমনটা বললে মনে হয় ভুল হবেনা। আমরা রাজন, রবিউলের মতো ঘটনাও দেখেছি। প্রতিনিয়ত নানা ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটছেই। হত্যাকান্ড, পাশবিক নির্যাতন, একের পর এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা যখন ঘটছে, তখন সামগ্রিক এই পরিস্থিতি আমলে নেয়ার বিকল্প নেই। অনেকের মতো আমারও প্রশ্ন দেশে হচ্ছেটা কি? এ দেশে কি আইনের শাসন নেই? এ দেশের মানুষ এতো ভয়ংকর কেন? এ দেশের মানুষের মনুষ্যত্ব এতো অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হয়েছে কেন? তাহলে প্রশ্ন করতে পারিনা যে, এখন কোন সভ্যতায় আছি আমরা, আসলে এটি সভ্য সমাজ বলা যাবে? না অসভ্য সমাজ বলা অন্যায় হবে?

এ নৃশংস ও নৈরাজ্য থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। আমাদের সকলের সজাগ থাকতে হবে, শুধু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আর সরকারের প্রতি ভরসা রাখলেই হবেনা। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, কেবল সতর্কতা জারি করে সুফল পাওয়া কঠিন। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। পাড়ায় পাড়ায় নেওয়া যেতে পারে সচেতনতামূলক কর্মসূচি। মনে রাখতে হবে, যে কোনো অপরাধই আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার জন্য কলঙ্কজনক।

সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, সামগ্রিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিশ্চিত হোক এমনটি কাম্য। আমাদের মানবিকতা, মানসিকতা আর মনুষত্বের পরিবর্তন আনতে হবে, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, মানবতার প্রতি সম্মান রাখতে হবে, জীবনের প্রতি মায়া থাকতে হবে। তাহলেই আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে দাবি করতে পারবো আর স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবো। বিশের কাছে সুনাগরিক বা একটি সম্মৃদ্ধশালি দেশ হিসেবে গর্বিত হবো।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক

আরও পড়ুন...

ঘরে বসেই নিজের বিকাশ একাউন্ট খুলুন