জামালপুরে গৃহবধূকে গণধর্ষণ ও স্বামীকে ফাঁস দিয়ে হত্যা

পিবিএ,জামালপুর: রাতে গৃহবধূকে গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হাত-পা বেঁধে শারীরিক নির্যাতন ও গৃহবধূর সামনে স্বামীকে পিটিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যার পর বাড়ির পাশে কাঁঠাল গাছে ঝুলিয়ে রেখে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে ধর্ষকরা। পুলিশ পরের দিন সকালে ধর্ষিতাকে পাশের বাড়ি থেকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে তার স্বামীর লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠালেও ধর্ষিতার কোনো অভিযোগ নেয়নি। স্বামীর লাশের সাথে ধর্ষিতা গৃহবধূকে থানায় নিয়ে এলেও ময়নাতদেন্তর পর লাশের সাথেই তাকে বাড়ি পাঠিয়েছে পুলিশ।

এলাকার প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ও ধর্ষকদের ভয়ে ৩দিন অবরুদ্ধ থাকার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে সোমবার (১৮ নভেম্বর) রাতে ধর্ষিতা গৃহবধূ, শ্বশুর ও মামা শ্বশুর রাত পৌনে ৮টায় জামালপুর প্রেসক্লাবে এ অভিযোগ করেন। রাত ৮টা ২০মিনিটে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ধর্ষিতা ভর্র্তি হবার পর রাত সাড়ে ১১টায় অবশেষে ‘নির্যাতন ও গণধর্ষণ’ মামলা নিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, কেউ অভিযোগ করেনি তাই এতদিন মামলা নেওয়া হয়নি। রাতেই শাওন নামে এক ধর্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

জামালপুরের শ্রীপুর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের খলিলুর রহমানের স্ত্রী ধর্ষিতা গৃহবধূ (শাহিদা, ২৫) পিবিএকে জানিয়েছেন, শুক্রবার রাত ৮টার সময় প্রতিবেশী ময়ান উদ্দিনের ছেলে ছানোয়ার হোসেন ছানু, আব্দুল হকের ছেলে শাওন ও ওমর আলীর ছেলে রফিজ মিলে মুখ চেপে আমার বাড়ি থেকে আমাকে উঠিয়ে নেয়। ছানুর বাড়ির পেছনে জঙ্গলে নিয়ে তিন জন মিলে আমাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর ছানুর বাড়িতে নিয়ে আমাকে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক মারধর করে। খবর পেয়ে আমার স্বামী খলিলুর রহমান আমাকে উদ্ধার করতে গেলে আমার চোখের সামনে তাকেও ইচ্ছামতো মারধর করে। তারপর আমাদের বাড়ির পাশে কাঁঠাল গাছে আমার স্বামীকে ফাঁসি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখে।

ধর্ষকরা কিছুক্ষণ পর এসে আমাকে বলে যে, তোর স্বামী ফাঁসি দিয়ে মারা গেছে। আমি আমার স্বামীর মুখটা দেখার জন্য অনেক কাঁকুতি-মিনতি করলেও তারা আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়নি। সারারাত আমাকে এভাবেই বেঁধে রাখে। পরের দিন সকালে পুলিশ গিয়ে ছানুর ঘর থেকে আমাকে উদ্ধার করে। আমার স্বামীর লাশ উদ্ধার করে আমাকেও থানায় নিয়ে এসেছিল। পুলিশকে অনেক বলেছি, তারা আমার কোনো কথাই শোনেনি।

সোমবার রাত ৮টা ২০মিনিটে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসে ভর্তি হয়েছেন ধর্ষিতা গৃহবধূ। কর্তব্যরত ডাক্তার হাসানুল বারী শিশির পিবিএকে জানিয়েছেন, ধর্ষিতার গোপনাঙ্গ থেকে রক্ত ঝরছে। গোপনাঙ্গে ফোলাজখম ও শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকায় প্রাথমিকভাবে গণধর্ষণের ধারণা করা হচ্ছে। ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্নের পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ধর্ষিতার মামা শ্বশুর শ্রীপুর ইউনিয়নের মাটিখোলা গ্রামের মৃত মুন্তাজ আলী খার ছেলে আমীর খা পিবিএকে জানিয়েছেন, প্রেসক্লাবে এসেছি, হাসপাতালে ভাগ্নে বউকে ভর্তি করেছি জেনে শ্রীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আজিজুল হক আমাকে ফোনে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে। এ ঘটনায় রাত ১১টার দিকে কর্মরত সাংবাদিকরা জামালপুর থানায় গিয়ে ওসি মো. সালেমুজ্জামানের সাথে কথা বলার সময় জামালপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি হাফিজ রায়হান সাদার মোবাইলে (রেকর্ডেড) ফোন করেন ওই চেয়ারম্যান।

ফোনে তিনি তার এলাকার ছেলেদের (ধর্ষক) নামে মামলা না হবার জন্য নিরুৎসাহিত করেন। একপর্যায়ে ওই চেয়ারম্যান বলেন, এসব পোলাপান আমার। আমার পোলাপান বেকদায় পড়বো, এটা অবশ্যই আমাকে দেখতে হবে। খলিলকে মার্ডার করে থাকলে আমার আপত্তি নাই তো, এটা থানা-পুলিশ দেখবে। কিন্তু বেহুদা হয়রানি করবো, আমি ছাড়বো না। ধর্ষণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওই চেয়ারম্যান বলেন, ওই মেয়ে একটা নষ্ট মেয়ে।

ধর্ষিতা গৃহবধূর শ^শুর ইমান আলী পিবিএকে জানিয়েছেন, আমার ছেলে কাঠমিস্ত্রি। সে বাজারে ছিল। রাতে আমার পুত্রবধূ বাইরে বের হলে তাকে মুখ চেপে তুলে নিয়ে যায় প্রতিবেশী ওই ধর্ষকরা। রাত ১১টার দিকে আমি এ খবর পেলে বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখি, কাঁঠাল গাছে আমার ছেলের লাশ ঝুলছে। পুত্রবধূকে ছানুর বাড়িতে বেঁধে রেখেছে। সবার হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। ভয়ে আমি ছানুর বাড়িতে যেতে পারিনি। রাতেই পুলিশকে খবর দিয়েছি। সকালে পুলিশ এসে ছানুর বাড়ি থেকে আমার পুত্রবধূকে উদ্ধার করে ছেলের লাশের সাথে থানায় নিয়ে যায়।

জামালপুর থানার ওসি মো. সালেমুজ্জামান পিবিএকে বলেছেন, শনিবার (১৬ নভেম্বর) নিহত খলিলুরের নামে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগ তখন করে নাই, তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। ধর্ষিতা হাসপাতালে ভর্তি হবার পর সোমবার (১৮ নভেম্বর) রাত সাড়ে ১১টার দিকে থানায় এসে অভিযোগ করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে নির্যাতন ও গণধর্ষণের মামলা নিয়েছি। রাতেই ধর্ষক শাওনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাজন্য রুহানি

আরও পড়ুন...