জামালপুরে শনাক্তের হার ২৪, সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে পৌর এলাকা

রাজন্য রুহানি, জামালপুর: জামালপুর জেলায় করোনা সংক্রমণের হার লাফিয়ে বাড়ছে। গত ১৩ জুন থেকে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করলেও সংক্রমণের হার একটুও কমেনি। অনেকটা নামে মাত্র কঠোর বিধিনিষেধ, বাস্তবে এর কোনো প্রভাব না থাকায় জামালপুর পৌরসভা এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। প্রশাসনের তৎপরতার অভাবে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুধীজনরা।

কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হলেও পৌর এলাকার সব ধরনের যানবাহনে লোকজন চলাচল করছে আগের মতোই। সিএনজি ও অটোরিকশাগুলোতে যাত্রীতে গাদাগাদি। বেশিরভাগ লোকজনের মুখে মাস্ক নেই। অফিস-আদালত ও মার্কেটগুলোতে নেই কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই। বাজারেও ঠাসাঠাসি মানুষ। সামাজিক দূরত্ব এখানে আকাশকুসুম কল্পনা যেন। প্রত্যেকের চলাফেরায় এক ধরনের গা-ছাড়া ভাব বিরাজমান।

শহরের অফিস-আদালতসহ পাথালিয়া, বকুলতলা, সকাল বাজার, তমালতলা, দয়াময়ী, গেইটপাড়, পাঁচরাস্তা এলাকা ও মার্কেটগুলো ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

মানুষজনের মধ্যে উদাসীনতা ও প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য তৎপরতার অভাবকেই দায়ী করছেন সুধীমহল। ফলে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে পৌর এলাকার মানুষজন। এরমধ্যেই পৌর এলাকায় রেকর্ড পরিমাণ শনাক্ত হওয়ায় এই শঙ্কা পৌরবাসীর মনে জেঁকে বসেছে বলে মনে করছেন সচেতন মানুষেরা।

জেলায় ২৪ ঘন্টায় ১৭৬ টি নমুনা পরীক্ষায় ৪২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এরমধ্যে জামালপুর পৌরসভা এলাকাতেই রয়েছেন ৩৬ জন। পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২৩.৮৬ ভাগ।

এর আগে, গতকাল ৯৩ টি নমুনা পরীক্ষায় ১৪ জনের করোনা হয়েছিল। যার শতকরা হার ছিল ১৫.০৫ ভাগ।

গত ১ সপ্তাহের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সদর উপজেলা ও অন্যান্য উপজেলার চেয়ে জামালপুর পৌরসভা এলাকায় শনাক্তের সংখ্যা বেশি। এছাড়া পৌরসভার গুটি কয়েক এলাকা ছাড়া সব এলাকাতেই করোনা আক্রান্ত রয়েছে। করোনা সংক্রমিত এসব এলাকাতে বাড়ছে শনাক্তের হারও।

বৃহস্পতিবার (১৭ জুন) জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা আপডেটে জানায়, জামালপুর শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে ১ম ও ২য় ধাপে মোট ১৬২ টি নমুনা পরীক্ষায় ৩৯ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে জামালপুর জেলার স্থায়ী নিবাসীর ১০ টি নমুনা পরীক্ষায় ২ জন এবং জেলা/উপজেলা পর্যায়ে রেপিড এন্টিজেন টেস্টে ৪ টি নমুনা পরীক্ষায় ১ জন অর্থাৎ মোট ১৭৬ টি নমুনা পরীক্ষায় আরও মোট ৪২ জনের কোভিড-১৯ সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

এতে জামালপুর সদর উপজেলায় রয়েছে ৩৬ জন, মেলান্দহ উপজেলায় ২ জন, মাদারগঞ্জ উপজেলায় ১ জন, সরিষাবাড়ী উপজেলায় ২ জন ও বকশীগঞ্জ উপজেলায় ১ জন।

সদর উপজেলার মধ্যে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ১ জন, পাথালিয়ায় ৫ জন, দেওয়ানপাড়ায় ২ জন, স্টেশন রোডে ১ জন, দড়িপাড়ায় ১ জন, বাগেরহাটায় ৩ জন, বানাকুড়ায় ২ জন, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য অফিসে ১ জন, কাচারীপাড়া ৪ জন, মুকুন্দবাড়ীতে ১ জন, বন্দেরবাড়ীতে ১ জন, বামুনপাড়ায় ২ জন, ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ১ জন, বোষপাড়া ২ জন, তিরুথায় ১ জন, শেখ হাসিনা মেডিকেল কলেজে ১ জন, কম্পপুরে ২ জন, বকুলতলায় ১ জন, ছনকান্দায় ১ জন, শরিফপুরে ১ জন ও দিগপাইতে ২ জন।

জেলায় এ পর্যন্ত ২৩২৬৩ টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে ২৪৪৪ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং মারা গেছে ৩৯ ব্যক্তি। এরমধ্যে সুস্থ হয়েছে ২২১৫ জন।

কী কী কারণে পৌরসভা এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে, জানতে চাইলে জামালপুর প্রেসক্লাবের সাধরণ সম্পাদক এটিএন বাংলার সাংবাদিক লুৎফর রহমান পিবিএ’কে বলেন, ১৩ জুন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। বাস্তবে এর কোনো প্রভাব নেই। বিগত সময়ে দেখেছি মোড়ে মোড়ে পুলিশের অবস্থান, চেকপোস্ট ও ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতি ছিল, এবার এরকম কিছুই চোখে পড়ছে না। প্রশাসনের এই তৎপরতার অভাবকেই মানুষের মধ্যে উদাসীনতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, মানুষ তো মানবেই না, মানাতে হবে।

এছাড়া পর্যাপ্ত মাইকিংয়ের ব্যবস্থা না থাকা এবং ঢিলেঢালা সচেতনামূলক কার্যক্রমের জন্য পৌর এলাকা সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, হাট-বাজার-ঘাট সব স্বাভাবিক নিয়মেই চলছে। কোথাও কোনো কঠোর বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েনি।

সংক্রমণের হার কমাতে তিনি সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে বলেন- মানুষজনের চলাফেরা সীমিত করতে হবে। জনসমাগম হয় এমন স্থানের দৈনন্দিন কার্যক্রম প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পরিচালিত হতে হবে এবং মাস্ক পরতে হবে অবশ্যই।

এ বিষয়ে সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা লিটুস লরেন্স চিরান পিবিএ’কে জানান, সংক্রমণের হার কমিয়ে আনতে আমরা মানুষজনকে কঠোর বিধিনিষেধ মানাতে চেষ্টা করছি। সেজন্য ভ্রাম্যমাণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অধিকাংশ মানুষজনের মধ্যে মাস্ক পরার অনীহা এবং লকডাউন না মানার এক ধরনের ফাঁকিবাজির ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। আমরা চেষ্টা করছি এটা যাতে না হয়।

পিবিএ/রাজন্য রুহানি/এমএসএম

আরও পড়ুন...