দারিদ্রতা তাদের জন্য বড় বাঁধা


শামিনূর রহমান,নওগাঁ: কিছুদিন আগেও যেখানে মেয়েদের খেলা নিয়ে আমাদের সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হতো। কিন্তু মেয়েরা যখন নিজেদের প্রতিভায় দেশ ও দেশের বাহিরে থেকে স্বর্ণ জয় করে পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের মুখ উজ্জ্বল করছে তখন সেই ভুল ধারনা পরিবর্তন হয়েছে। মেয়েদের এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ জাগানো হচ্ছে। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এসব খেলোয়ারদের সাধ থাকলেও সাধ্য নাই। খেলার জন্য যেসব সরঞ্জামের প্রয়োজন তা তাদের নেই। ছেলেদের কাছ থেকে সরঞ্জাম চেয়ে নিয়ে নিত্য দিনে অনুশীলন করতে হচ্ছে। তাদের খেলার সরঞ্জাম দিয়ে ও উপযুক্ত অনুশীলনের ব্যবস্থা করা গেলে তারা দ্রুত লক্ষ্যে পৌছাতে পারবে বলে ধারনা করা হচ্ছে।

নওগাঁ সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার দরিদ্র আর বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে এসব মেয়েরা খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা একটু সহযোগীতা পেলে আরো ভাল করবে এমনটা মনে করছেন সচেতনরা।

ইকরকুড়ি গ্রামের খুদে অ্যাথলেটিকস সুমাইয়া আক্তার (১৩) জানায়, ইকরকুড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে। স্কুল পর্যায়ে যেসব খেলা হতো সেসব খেলায় অংশ নিতাম। আমাদের স্কুল থেকে জেলা পর্যায়ে খেলা হয়েছিল। একদিন জিল্লুর রহমান স্যার আমার পরিবার ও আমার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তার প্রতিষ্ঠান থেকে আমাকে প্রশিক্ষণ করাতে চান। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। আমরা দরিদ্র হওয়ায় তিনি ফ্রিতে অনুশীলন করাতে চাইলেন। স্যারের প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৯ সালে কুমিল্লা জেলায় লংজাম্পে অংশ নিয়ে গোল্ড মেডেল পেয়েছি।

সুমাইয়া জানায়, অ্যাথলেটিকস এর মধ্যে তার পছন্দ দৌড় এবং লংজাম্প। পড়াশুনার পাশাপাশি খেলাধুলা চালিয়ে যেতে চায়। এ মাসে (নভেম্বর) ঢাকাতে জুনিয়র মিড খেলা হবে। এতে অংশ নেয়ার জন্য অন্য জেলায় ক্যাম্পিন হয়। কিন্তু আমাদের এখানে কোন ক্যাম্পিন করানো হয়না। যদি ক্যাম্পিন হতো আমাদের জন্য আরো ভালো হতো।
সদর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে কণা। বাবা দিনমজুর। তিন বোনের মধ্যে কণা দ্বিতীয়। সান্তাহার মহিলা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বর্ষে মানবিক বিভাগে পড়াশুনা করছে। চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ার সময় ফুটবল খেলায় আগ্রহী দেখায়। এরপর মাধ্যমিকে যাওয়ার পর স্কুলের শরীরচর্চা শিক্ষকের কাছে মেয়েদের জন্য ফুটবল ও ক্রিকেট খেলাধুলা হাতেখড়ি। অষ্টম শ্রেনীতে পড়ার সময় স্কুল পর্যায়ে জেলাতে বিজয়ী হওয়ার পর ২০১৯ সালে বিভাগে গিয়ে পরাজিত হয়।

কণা জানান, খেলাধুলা করার কারণে গ্রামের মানুষরা বিভিন্ন কথা বলতো। ক্ষোভের কারণে দুই মাস খেলা বন্ধ রাখি। পরে বাবা-মা আবারও উৎসাহ জোগায়। মানুষের কথায় তো আর নিজের স্বপ্নকে থেমে রাখতে পারিনা। তবে গ্রামের মানুষরা এখন আর কিছু বলেনা। জিল্লুর রহমান স্যার আমার আগ্রহ দেখে তার প্রতিষ্ঠানে ফ্রিতে খেলার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি নিজেই আমাদের খেলা শিখান।

কণা আরো জানায়, দরিদ্র পরিবারের কারণে পোশাক ও জুতাসহ খেলার সরঞ্জাম কেনা সম্ভব হয়না। ছেলেদের বল ও ব্যাট নিয়ে প্যাকটিস করতে হয়। নিজের সরঞ্জাম থাকলে বেশি ভাল হয়। ভাল একজন ব্যাটিং হয়ে ন্যাশনাল টিমে যাওয়ার ইচ্ছ। জানিনা সে স্বপ্ন পুরন হবে কিনা।

কণার মা কণক বলেন, আগে তো গ্রামের মানুষ বিভিন্ন কটু কথা বলতো। কিন্তু এখন আর কোন ধরনের কটু কথা বলে না। বরং মেয়েদের তারা উৎসাহ দেয়। আমরা গরীব মানুষ। দিনমজুরের কাজ করে সংসার চলে। মেয়েকে খেলার উপকরণ ঠিকমতো কিনে দিতে পারিনা। এছাড়া অনুশীলনের পর যে ধরনের খাবার দিতে হবে সেটাও দিতে পারিনা।

পার-নওগাঁ মহল্লার রওনক জাহান সেতু জানায়, ২০১৯ সালে বিকেএসপিতে হকিতে চান্স পেয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আমি যায়নি। কারণ আমার পছন্দ ক্রিকেট। বিকেএসপি থেকে আবারও ফরম তুলেছি এখন ফলাফলের অপেক্ষায়। জাতীয় মহিলা টিমে খেলার ইচ্ছে আছে।

তিতাস অধিকারী জানায়, ছোট থেকেই খেলার প্রতি খুবই দূর্বল। ক্রিকেট খেলা আমার পছন্দ। জাতীয় মহিলা টিমে খেলার ইচ্ছে আছে। জানিনা সে স্বপ্ন পুরন হবে কিনা।

নওগাঁ বেসিক ক্রিকেট একাডেমির পরিচালক জিল্লুর রহমান বলেন, জেলায় প্রমিলা/মহিলা কোন ক্লাব না থাকায় অনেক মেয়েরা খেলা শিখতে পারেনা। অনেকের স্বপ্ন থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হয়না অনুশীলনের অভাবে। আমার প্রতিষ্ঠানে ছয়জন মেয়ে আছে। তারা সবাই দরিদ্র পরিবারের। আবার অনেকের ইচ্ছা থাকলেও দরিদ্রতার কারণে খেলা শিখা সম্ভব হয়না। যে ছয়জন আছে স্কুল পর্যায়ে তাদের আমি খেলা দেখেছি। এরপর তাদের এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে কথা বলেছি। তারা এগিয়ে যেতে চায়। তাদের ভর্তি ফি ফ্রি করে দেয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ২০১৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে একজন লংজাম্প এ গোল্ড মেডেল পেয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) দুইজন একমাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, আমার প্রতিষ্ঠানে ১২৫ জন ছেলে এবং ৬ জন মেয়ে রয়েছে। তাদের সকলের বাড়ি আশপাশে। বয়স অনুযায়ী চারটি গ্রুপে ভাগ করে নওগাঁ স্টেডিয়াম মাঠে পর্যায়ক্রমে অনুশীলন করানো হয়। সকাল সাড়ে ৬টা থেকে সাড়ে ৮টা, ৮.৪৫ মিনিট থেকে ১০.৪৫ মিনিট, ১১টা থেকে ১২.৩০ মিনিট এবং বিকেল ২.৪৫ মিনিট থেকে ৫.১৫ মিনিট পর্যন্ত। আমার উদ্যেশে ভাল একটা টিম তৈরী করে লীগে মেয়েদের অংশ গ্রহনের সুযোগ করে দেয়া।

পিবিএ/এমএসএম

আরও পড়ুন...