নার্সারী চাষী নুর উদ্দিনের ভাগ্য বদলের গল্প


পিবিএ,  লক্ষ্মীপুর :  জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারনে বারবার ক্ষতিগস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। বেশি ক্ষতিগস্ত হয় উপকূলীয় জেলাগুলো। তাইতো উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সদর উপজেলার নুর উদ্দিন গড়ে তুলেছেন ‘মায়ের দোয়া আল আমিন’ নামে নার্সারী। এখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ফলদ, বনজ, ফুল ও সবজির চারা কলম উৎপাদন ও বিক্রয় করা হয়।

নুর উদ্দিন উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নের তোতারখিল গ্রামের মৃত. শরাফত আলী’র ছেলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পূর্বে তারা বাবা ডায়েরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন নুর উদ্দিনের বয়স ছিল মাত্র ১ বছর ৯ মাস। সংসারে অভাব অনটনের কারনে সন্তানকে খুব বেশি দুর পড়ালেখা করাতে পারেননি বিধবা মা জীবনের নেছা।

পরিবারের কিছুটা অভাব মোচন করতে নুর উদ্দিন কিশোর বয়সেই লেগে যান কাজে। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের কাজ করেন তিনি। কয়েকদিন ঢাকার সদরঘাট এলাকায় জুতার ব্যবসা করেন। ১৯৮৮ সালে বন্যায় তার ব্যবসা ক্ষতিগস্ত হয়। ওইসময় তিনি চলে আসেন নিজ এলাকায়। এলাকায় বিভিন্ন কাজের পাশাপাশি অনির্বান ক্লাব নামে একটি সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত হন তিনি। একদিন ওই ক্লাবের আঙ্গিনায় লাগানোর জন্য পার্শ¦বর্তী একটি নার্সারীতে গিয়ে দুটি গাছের চারা ক্রয় করেন। তখন থেকেই গাছ ও নার্সারীর সঙ্গে মিশে যান তিনি। স্বপ্ন দেখেন নার্সারী করার। নিজের কাছে গচ্ছিত থাকা মাত্র পাঁচশত টাকা নিয়ে তিনি গাছের চারা কেনাবেচা শুরু করেন। প্রথমে ভ্যান গাড়ি ভাড়া করে বিভিন্ন নার্সারী থেকে বীজ, চারাগাছ ও কলম ক্রয় করে হাটবাজারে বিক্রি করতেন।

সে ১৯৯৩ সালে ২ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে ৩৬ শতাংশ জমি ইজারা নিয়ে নার্সারী শুরু করেন। কোন প্রশিক্ষন না থাকলেও দেখে দেখে নার্সারী ব্যবসার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি। এভাবেই ভাগ্য বদলে যায় নুর উদ্দিনের। ২০১০ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নের বসুদুহিতা গ্রামে প্রায় ৩ একর জমি ইজারা নিয়ে ‘মায়ের দোয়া আল আমিন’ নামে আরো একটি নার্সারী দেন। এটাই এ অ লের সবচেয়ে বড় নার্সারী। এ নার্সারীর পাশেই রয়েছে নবনির্মিত চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন।

নুর উদ্দিনের বয়স এখন প্রায় ৫৮ বছর। তার সংসারে রয়েছে স্ত্রী, ৪ মেয়ে ও ১ ছেলে। ছেলে আল আমিন পড়ছে স্থানীয় একটি স্কুলের নবম শ্রেণিতে। ছোট মেয়ে শাহীনুর আক্তার এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। সেজো মেয়ে খালেদা আক্তার পড়ছে কলেজে। বড় দুই মেয়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে। শুধুমাত্র নার্সারীর আয় দিয়েই ভালোভাবে চলছে নুর উদ্দিনের সংসার। তিনি দায়িত্ব পালন করছেন জেলা নার্সারী এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি পদে।

প্রায় তিন একর জমি জুড়ে মায়ের দোয়া আল আমিন নার্সারী। বর্তমানে প্রায় ২৫ লাখ টাকা মূল্যের চারা গাছ রয়েছে এ নার্সারীতে। এর মধ্যে রয়েছে শতাধিক প্রজাতির ফলদ, বনজ, ঔষধি, শাক সবজি ও ফুল গাছের চারা। নার্সারীর আয় দিয়ে ভালোভাবেই চলছে নুর উদ্দিনের সংসার। এখানে নিয়মিত কাজ করে ১০-১২ জন শ্রমিক জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিমাসে শ্রমিকদের মজুরী ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা আয় হয় বলে জানিয়েছেন নুর উদ্দিন। বাৎসরিক হিসাবে লাভের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার মতো। তবে জমির ইজারা বাবদ প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয় তাকে।

এই নার্সারীতে দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ও কৃষি গভেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রায় পর্যবেক্ষণে আসেন। চট্টগ্রাম, বরিশাল, বগুড়া ও ঠাকুরগাঁওসহ বিভিন্ন জেলা থেকে নার্সারীর জন্য বীজ, গাছের চারা ও কলম সংগ্রহ করেন নুর উদ্দিন। আবার নিজের নার্সারী থেকেও তিনি বিভিন্ন জেলায় চারাগাছ ও কলম সরবরাহ করে থাকেন। তবে সারা বছরই জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বীজ, চারাগাছ ও কলমের চাহিদা মিটে এ নার্সারী থেকে। সর্বনিম্ন ১০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের চারাগাছ ও কলম রয়েছে এখানে। এ নার্সারীতে মাসিক বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ টাকা।

আক্ষেপ করে নুর উদ্দিন বলেন, গত কয়েক বছর পূর্বে অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে ১৫ লাখ টাকার বীজ, চারাগছ ও কলম নষ্ট হয়ে যায়। এরপর জেলা প্রশাসকের নিকট সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করেন তিনি। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও কোনো সহযোগিতা পাননি। অথচ নার্সারী একটি উৎপাদনমুখী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে রাষ্ট্রের কল্যাণে অবদান রাখছে।

বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংকে ১০ লাখ ও ব্র্যাক এনজিওতে ৫ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে নুর উদ্দিনের। তাছাড়া আরো ৫ লাখ টাকা আত্মীয় স্বজনকে দেনা রয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত ৭টি মেলায় অংশগ্রহণ করে উন্নত মানের বীজ, গাছের চারা ও কলম প্রদর্শনীতে ৬ বার পুরস্কার জিতেছেন নুর উদ্দিন।

পিবিএ/ফরহাদ হোসেন/বাখ

আরও পড়ুন...