পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না সড়ক ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ

পিবিএ ডেস্কঃ লালমনিরহাটকুড়িগ্রামের প্রবেশ মুখে রংপুরের তিস্তা সড়ক সেতুর খোলা হাওয়ায় জমে উঠেছে ঈদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দের ঢেউ। পবিত্র ঈদউল ফিতরের ছুটিতে নির্মল আনন্দ নিতে সব বয়সি মানুষ ভির করেছেন মরা তিস্তা পারের এই সেতুতে। কিন্তু এখানে দীর্ঘ বছরেও গড়ে উঠে নি পার্ক, ছাউনি, টয়লটেসহ দর্শনার্থীদের জন্য কোন সুবিধা। ফলে এই সেতুটিকে ঘিরে পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও তা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন এবং সড়ক জনপদ কর্তৃপক্ষ।

দাবির দুইশ বছর: লালমনিরহাট কুড়িগ্রামের সাথে রংপুরসহ গোটাদেশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্রিটিশ আমল থেকেই নেই। ১৮৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার রংপুরের কাউনিয়া লালমনিরহাটের সদর সীমান্তে তিস্তা নদীর ওপর রেলওয়ে সেতু নির্মাণ করলে শুধু ট্রেন যোগাযোগ চালু হয়। কিন্তু ১৯৩৮ সালে সেটির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। সাবেক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে মেয়াদোত্তীর্ন ওই রেলওয়ে সেতুতে কাঠের পাটাতন দিয়ে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করেন। সেই থেকে প্রতিদিনই দুর্ঘটনাকে সঙ্গি করে দুই জেলার বাসিন্দারা কষ্টেশিষ্টে চলাফেরা করে আসছিলেন। অনিবার্য বাস্তবতায় এখানে দুই বছর ধরে দাবি ওঠে একটি সড়ক সেতু নির্মাণের। ২০১২ সালের ২০ প্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেয়া হয় রংপুর অঞ্চলের স্বপ্ন বিভোর মানুষগুলোর দুই বছরের দাবী, অনেক আন্দোলন, শংকার  বহুল প্রত্যাশিত তিস্তা সড়ক সেতু। ৎকালীন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটির উদ্বোধন করেন।

যেভাবে বেড়ে ওঠে তিস্তা সড়ক সেতু: অব্যাহত দাবির প্রেক্ষিতে রেলওয়ে সেতুটির পূর্বপার্শ্বে ২০০১ সালের জুলাই ৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাতিস্তা সড়ক সেতুনির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করেন। এরপর প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় সড়ক জনপদ বিভাগ সেতুটি নির্মাণের ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে নি। বিএনপিজামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৬ সালের আগষ্ট ৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পুনরায় সেতুটির নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এরপরই কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে তিস্তা সড়ক সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সড়ক জনপদ বিভাগ সূত্র জানায়, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক জনপদ বিভাগসেতু প্রকল্পেরআওতায় ৭৫০ মিটার দীর্ঘ ১২ দশমিক মিটার প্রস্থের তিস্তা সড়ক সেতু   দশমিক ২৯২ কিলোমিটার এপ্রোচ সড়ক  ৭৫০ মিটার ব্যাঙ্ক প্রটেকশনের এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৮৭ কোটি লাখ হাজার ৩৬ টাকা। কিন্তু দফায় সময় বৃদ্ধির কারনে প্রকল্প ব্যয় ৩৪ কোটি ৯৭ লাখ ৯৫ হাজার ৯৩৬ টাকা বৃদ্ধি হয়ে দ্বাড়ায় ১২২ কোটি লাখ টাকায়। আমিনডেলিমআসকো জেভি নামের যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটি নির্মাণ করে। আর এর দেখভালের দ্বায়িত্ব পালন করেন বিসিএলটায়েফইস্টুপ জেভি নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সেতুটি খুলে দেয়া হলে এই অঞ্চলে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন হয়। পুরোনো রেলওয়ে সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত থাকে।

পর্যটনের সম্ভাবনা থমকে আছে: উদ্বোধনের পর থেকেই প্রতিদিনই এই সেতুটিকে দেখতে ছুটে আসছেন আশপাশ এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ।  একটি নতুন সেতুর পাশে পুরোনো রেলওয়ে সেতুমাঝ দিয়ে বয়ে চলা মরা তিস্তার বিভিন্ন সময়ের খেয়ালি ভাব উপভোগ করতে আসা মানুষ একটু জিরিয়ে সময় নিয়ে দেখতে চান।  বিশেষ করে সন্ধাবেলা এখানে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্ধর্য্য অনেক বেশী উপভোগ্য হয়ে উঠে। দুই ঈদ, পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন পার্বনে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে টইটম্বুর থাকে তিস্তার বেলাভূমি। দাবি উঠে সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার। কিন্তু দীর্ঘ  বছরেও এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার কোন উদ্যোগ নেয় নি কর্তৃপক্ষ। সময়ের ব্যবধানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু মানুষ স্পীড বোর্ড নৌকার ব্যবস্থা করেছেন। দর্শনার্থীরা সেগুলোতে উঠে দুই সেতুর মাঝ দিয়ে তিস্তার পানির আনন্দ উপভোগ করেন। কিন্তু এখানে কোন টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। এতে নারী শিশু দর্শনার্থীরা সময় নিয়ে থাকতে পারেন না। শিশুদের বিনোদনের জন্য কোন রাইড স্থাপন করা হয় নি। ভ্রাম্যমান খাবারের দোকান বসে খোলা আকাশের নীচে। প্রচন্ড রোদে এখানে কোন জায়গা নেই বসার।

শুক্রবার মাগরিবের নামাজের ২০ মিনিট আগে দেখা গেছে পুরোনো সেতুর বিভিন্ন গার্ডার এবং সেতুর  ভিতরেও পাটাতনের ওপর মানুষে মানুষে ঠাসা। কিন্তু সেটি ঝুকিপুর্ণ। দর্শনাথীরা একথা জানেন না। তাদেরকে একথা জানিয়ে দেয়ার কোন লোকও পাওয়া যায় নি সেখানে। এছাড়াও পুরো মার্জিনাল ডাইক বাঁধ জুড়ে এলেমেলোভাবে মোটরসাইকেল এবং ভ্রাম্যমান দোকানী বসার কারনে দর্শনার্থীরা ভালোভাবে হাটাচলা করতে পারছেন না। সেটা দেখারও কেউ নেই। উপরন্ত ওই মার্জিনাল ডাইক বাঁধের ওপরেই কিছু আইনশৃংখলাবাহিনীর সদস্যকে দেখা গেছে বেঞ্চ নিয়ে বসে থাকতে। স্পীড বোর্ড নৌকায় একবার ঘূরে আসার জন্য ২০ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও অনেক মাঝি লোক বুঝে বেশী টাকা নিচ্ছেন। সেসব দেখার কোন লোক নেই সেখানে।

নাছির নামের এক মাঝির নৌকায় উঠেছিলেন রনজিত দাস তার সহকর্মী। একবার ঘুরে আসার পর তাদের কাছ থেকে নেয়া হয় ১৫০ টাকা। ঈদের বকশিশ হিসেবে নেয়া হয় ২০ টাকা। কিন্তু একইভাবে ঘুরে আসা আরেক নৌকাওয়লা জনপ্রতি নেন ২০ টাকা করে। বিষয়টি নিয়ে নাছিরের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেন নি।

তিনি জানান, এখানে যার কাছে যেমন পাই, সেরকম নেই। অপরিচিত লোকদের কাছে একটু বেশী নেই। নাছির জানালো শুক্রবার বিকেল পৌন টা পর্যন্ত তার আয় হয়েছে হাজার ৫৪০ টাকা।

পুরোনো সেতুর পাশে দর্শনার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসী জাকিয়া  জানালেন, এতো সুন্দর একটা ঘোরার জায়গা। কিন্তু কোন টয়লেট নেই। শিশুদের জন্য রাইড নেই। সন্ধার পর এখানে থাকা যায় না। বাজে ছেলেদের আনাগোনা বেড়ে যায়।

নতুন সেতুর ওপর কথা হয় নাজমুল আলম নামের একজন সরকারী কর্মকর্তার সাথে। তিনি জানান, সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কর্তৃপক্ষের অনেকর আগেই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা উচি ছিল। কিন্তু কেন তা করা হচ্ছে বিষয়টি আমার বোধগম্য নয়। এভাবে সম্ভাবনাকে নস্ট করা ঠিক নয়।

ঘুরতে আসা  ডাইক বাঁধে শিশু সন্তানকে নিয়ে বসে থাকা আমেনা ইসলাম জানালেন, এখানে সব জিনিসের দাম বেশী। কিন্তু মান খারাপ। শিশুরা একটা খেলনা পছন্দ করলে দোকানদাররা ইচ্ছেমত দাম হাকান। উপায় না থাকায় অভিভাবকরা চড়া দামেই কিনে দিতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, এসব নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কারণ এখানে নির্মল বিনোদনের জন্য আমরা আসি। সরকারের ব্যপারে পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

কাউনিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিঠুল জানান,  শুরুতেই এই সেতুটিকে ঘিরে এলাকাবাসি একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্ত কর্তৃপক্ষ কোন উদ্যোগ নেই। বরং সন্ধার পর এখানে দর্শনার্থীরা আর থাকতে চান না। নিরাপত্বার কারনে। অথচ এখানে মার্জিনাল ডাইক বাঁধের ওপর ছাতা করে দিলে বিশুদ্ধ বাতাসে দর্শনার্থীরা এখানে বসে তিস্তার ভাঙ্গাগড়ার কেলা উপভোগ করতে পারতেন। তিনি বলেন, সরকার পর্যটন কর্তৃপক্ষকে দিয়ে অথবা বেসরকারীভাবে লিজ দিয়েও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পরে। এতে সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব পাওয়ার পাশাপাশি মানুষের খোলা স্থানে নির্মল আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারে।

ব্যপারে সেতুটির তদারককারী প্রতিষ্ঠান লালমনিরহাট সড়ক জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশল আলী নুরায়েন জানান, সেতুটিকে ঘিরে কিভাবে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় সে ব্যপারে আমরা সরকারের ওপর মহলে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। ওপর থেকে জট খুললেই সেতুটিকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠবে। কারন এতো সুন্দর একটি নান্দনিক সেতু দেখতে মানুষ সব সময় আসতেই থাকবে। 

পিবিএ/এমএস

আরও পড়ুন...

ঘরে বসেই নিজের বিকাশ একাউন্ট খুলুন