বাবার প্রতি সন্তানের ৯ কর্তব্য

পিবিএ,ডেস্ক: বাবা এমন একটি শব্দ, যার সঙ্গে অনেক আবেগ, অনুভূতি জড়িত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পর সন্তানের জন্য বাবার অবদানই সবচেয়ে বেশি। যার মাধ্যমেই সব মানুষ পৃথিবীতে এসেছে। পৃথিবীর মুখ দেখতে সক্ষম হয়েছে মানুষ।

দুনিয়াজুড়ে মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে অনেক আলোচনা রয়েছে। আর মায়ের মর্যাদা বাবার চেয়েও অনেক বেশি। বাবা মর্যাদা সেভাবে আলোচিত হয় না। কিন্তু বাবারও রয়েছে অনেক সম্মান ও মর্যাদা। যা অনেকে সেভাবে চিন্তা করে না।

হাদিসের বিখ্যাত গ্রন্থ ইবনে মাজাহতে বাবার মর্যাদা সম্পর্কে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তুমি এবং তোমার সম্পদ, উভয়টিই তোমার বাবার।’

সুবহানাল্লাহ! এ হাদিসটির দিকে মনোনিবেশ করলে আমরা দেখতে পাই যে, বাবার মর্যাদা ইসলাম কত বেশি দিয়েছেন। অর্থাৎ আমাদের জীবন এবং আমাদের সম্পদ- এ সবটুকুতেই বাবার অধিকার পূর্ণ মাত্রায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

সুতরাং বাবার অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সচেতন না হই কিংবা অবহেলা করি তবে নিঃসন্দেহে কখনওই আমরা মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে পারবো না।

হাদিসের অনেক বর্ণনায় এসেছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কয়েক ব্যক্তির দোয়াকে মহান আল্লাহ ফেরত দেন না। তার মধ্যে এক ব্যক্তি হলো- সন্তানের জন্য বাবার দোয়া।’ এটাকে মহান আল্লাহ কখনও ফেরত দেন না।

আমরা যদি চাই যে, আমাদের বাবা আমাদের কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করুক, তবে বাবার সঙ্গে সর্বোত্তম আচারণ ও ভালো ব্যবহার করার বিকল্প নেই। কেননা সন্তানের যে কোনো কল্যাণে বাবার দোয়া বিফলে যায় না।

সুতরাং বাবার দোয়া লাভে এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখার তাগিদে বাবার প্রতি রয়েছে সন্তানের কিছু বিশেষ দায়িত্ব ও কর্তব্য। যা পালন করা জরুরি। আর তাহলো-

– বাবার কথা মেনে চলা
বাবার কথার আনুগত্য করা জরুরি। যেটাকে কুরআনুল কারিম এবং হাদিসে বা-মার আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়ে ‘বিররুল ওয়ালেদাইন’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তারা (বাবা ও মা) যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো অন্যায় আদেশ না করবে ততক্ষণ তাদের আনুগত্য করা বা নির্দেশ মেনে চলা জরুরি। তবে যদি তারা কোনো অন্যায় বা জুলুম করার নির্দেশ দেয়, শুধু তা মানা যাবে না।

– উচ্চ স্বরে কথা না বলা
বাবার সঙ্গে কথা বলার থেকে অবনত স্বরে কথা বলা। তাদের উচ্চ স্বরে কথা না বলা। কর্কশ ভাষায় কথা বলা যাবে না। তাদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলতে হবে। কুরআনুল কারিমের নির্দেশ হলো, ‘যখন তোমরা তাদের (বাবা-মার) সঙ্গে কথা বলবে তখন তাদরে সঙ্গে ধমক দিয়ে কথা বলবে না।’

– যথাযথ শ্রদ্ধা ও সম্মান দেখানো
সম্মান ও শ্রদ্ধা যতভাবে করা যায়, তার সবভাবেই বাবাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানো। সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, কেউ যদি বাবার সামনে তার নিজের জামা-কাপড় ঝাড়া দেয়, ধূলো-বালি থেকে এটাকে (জামা-কাপড়কে) পরিষ্কার বা মুক্ত করার জন্য ঝাড়া দেয় তবে সে ক্ষেত্রে এ সন্তান বাবা (মার) অবাধ্যতার গোনাহে লিপ্ত হলেন। কবিরাহ গোনাহ তথা মহাপাপ করলেন। কারণ, জামা-কাপড় ঝাড়া দেয়ার মাধ্যমে সে বাবার প্রতি অসম্মান করলেন।’

সুতরাং বাবা-মার সামনে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যাতে তাদের প্রতি অশ্রদ্ধাবোধ বা অসম্মান হয়।

– গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শ করা
যে কোনো প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাবার সঙ্গে পরামর্শ করা সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য। সে কাজের ব্যাপারে বাবার মতামত গ্রহণ করা। বাবার কাছে কাজ করার ব্যাপারে মতামত চাওয়া কিংবা কাজের অনুমতি নেয়া। সন্তান তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাবার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টিও অগ্রগণ্য।

– বাবার জন্য ব্যয় করা
নিজ সম্পদ থেকে বাবা-মার জন্য ব্যয় করা। তাদের পেছনে যে কোনো ধরনের ব্যয় করা সন্তানের জন্য আবশ্যক। তাদের চলাফেরার জন্য যদি প্রয়োজন হয় তবে সন্তানের প্রতি হুকুম ও কর্তব্য হলো বাবা-মার জন্য খরচ করা। তাছাড়া বাবার ভরণপোষণের দায়-দায়িত্ব সন্তান হিসেবে আমাদের উপর বর্তায়। তাই বাবা মার পেছনে ব্যয় করা।

– দোয়া করা
বাবার প্রতি সন্তানের অন্যতম কর্তব্য হলো তার জন্য দোয়া করা। তার জীবদ্দশায় যেমন দোয়া করা, তেমনি তার মৃত্যুর পরও এ দোয়া অব্যাহত রাখা সন্তানের জন্য একান্ত আবশ্যক। হাদিসে এসেছে-
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন, একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু কোনো ব্যক্তির সন্তান যদি বেঁচে থাকেন, আর সে সন্তান তার জন্য দোয়া করে তবে সন্তানের দোয়া আল্লাহ তাআলা বাবা-মার জন্য কবুল করেন। এভাবে দোয়া করা-
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণ : ‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।‘ (সুরা বনি-ইসরাইল : আয়াত ২৪)
অর্থ : ‘হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন; যেমনিভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।’

তাই বাবা-মার মৃত্যুর পর সন্তান যদি তাদের কল্যাণ চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করে তবে আল্লাহ তাআলা সন্তানের সে দোয়া কবুল করে নেন।

– বাবার বন্ধুদের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা
বাবা-মা জীবদ্দশায় যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করেছেন, চলাফেরা করেছেন, বাবা-মার সেসব বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর আচরণ করা। একবার হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এক লোক আসলেন, তিনি তার সঙ্গে খুব সুন্দর ও উত্তম আচরণ করেন। উপস্থিত সবাই তার সঙ্গে খলিফা হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর উত্তম আচরণ দেখে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এ ব্যক্তির সঙ্গে এতবেশি উত্তম আচরণ করলেন কেন?

উত্তরে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন যে, বাবার প্রিয়জন তথা বাবার বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ ও ভালো ব্যবহার করা। তাদের মৃত্যুর পরও তাদের বন্ধুদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করা।’

– বাবার ঋণ পরিশোধ করা
বাবার ঋণ পরিশোধ করা। বাবা-মা যদি কোনো ঋণ করে মৃত্যুবরণ করেন, তবে তা পরিশোধ করা সন্তানের জন্য আবশ্যক। কোনো সন্তানের সাধ্য থাকলে সে ঋণ পরিশোধে যথাযথ সচেষ্ট থাকতে হবে।

– বাবার অসিয়ত পূরণ করা
কোনো বাবা যদি সন্তানের প্রতি কোনো বিষয়ে জীবিত থাকাকালীন সময়ে অসিয়ত করে তবে তা পূরণ করা জরুরি। সাধ্য থাকলে বাবার যে কোনো ওসিয়ত পূরণ করা সন্তানের জন্য একান্ত আবশ্যক।

উল্লেখিত বিষয়গুলোতে বাবার জন্য সন্তানের এ করণীয়গুলো পালন করা জরুরি। আর তাতেই হাদিসের সে ঘোষণা বাস্তবায়ন হবে। যে ঘোষণা দিয়েছেন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি বলেছেন, ‘বাবার সন্তুষ্টিতেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি।’

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব সন্তানকে বাবা-মার প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করার তাওফিক দান করুন। দুনিয়াতেই জান্নাতের সুখবর লাভের তাওফিক দান করুন। বাবার প্রতি যথাযথ দায়িত্ববোধ পালন করার তাওফিক দান করুন।
পিবিএ/এসডি

আরও পড়ুন...