মধুমতির ভাঙনে নিঃস্ব দুই গ্রামের মানুষ

মাগুরায় মধুমতি নদীতে এখন তীব্র স্রোত না থাকলেও হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় মহম্মদপুর উপজেলা সদরের দুটি ইউনিয়নের ২ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উপজেলা সদর ইউনিয়নের ঢুষরাইল ও বালিদিয়া ইউনিয়নের হরেকৃষ্ণপুর গ্রামে পাঁচ দিনে নদীতে বিলীন হয়েছে অন্তত ৪০ পরিবারের বসতঘর।

ভাঙনের মুখে রয়েছে অন্তত ১০০ পরিবার। এছাড়া মধুমতি তীরবর্তী রুইজানি, কাশিপুর, গোপালনগর, ঝামা ও যশোবন্তপুর গ্রামে একের পর এক নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, গাছপালা। হুমকির মুখে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পাকা সড়ক, মসজিদসহ নানা সামাজিক স্থাপনা।

এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নিঃস্ব হবে অনেক মানুষ। বিলীন হবে জনপদ। বুধবার (২৪ নভেম্বর) সকালে সরেজমিন ঢুষরাইল ও হরেকৃষ্ণপুর গ্রাম ঘুরে মধুমতির ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে।

এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে গতকাল সকালে ভাঙনকবলিত দুটি গ্রাম পরিদর্শন করেছেন মাগুরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান। এ সময় সঙ্গে ছিলেন মহম্মদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আবু আব্দুল্লাহেল কাফি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রামানন্দ পাল।

ঢুষরাইল গ্রামের নূরুল ইসলাম শেখের (৬৫) ফসলি জমি ছিল প্রায় ৫ একর। সব জমি গত বছর নদীতে বিলীন হয়েছে। এক একর জমির ওপর ছিল তার বসতবাড়ি। এবার বিলীন হয়েছে তার বসতভিটা। জমিজমা ও বসতভিটা হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব।

গ্রামের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিন দশকে ওই তিন গ্রামের ৮০ ভাগ পরিবার ভাঙনের শিকার হয়েছে। এর অধিকাংশ পরিবার তিন-পাঁচবার ভাঙনের কবলে পড়েছে। অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বসতি গড়েছেন। অসচ্ছলতার কারণে যারা শহরে বা অন্যত্র যেতে পারেনি, তারা একবার এ পাড়ে, আরেকবার অন্য পাড়ে বসতি গড়ছে। কিন্তু এ ভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পাশাপাশি ঢুষরাইল ও হরেকৃষ্ণপুর গ্রাম নদীতে ভেঙে ছোট হয়ে গেছে। নদীর মহম্মদপুর পাড় থেকে পিছিয়ে বসতি গড়েছে অনেকে। বেশির ভাগ পরিবার নদীর অপর পাড়ে বসতবাড়ি করেছে। ওই অংশের নাম এখন চরঢুষরাইল।

ঢুষরাইল ও হরেকৃষ্ণপুর গ্রাম দুটিতে এখন ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীতে ভাঙন ছিল না। বর্ষা শেষে পানি কমে যাওয়ার সময় ভাঙন তীব্র রুপ ধারণ করেছে। গত পাঁচ দিনে নদী তীরের ৪০টি পরিবারের বসত বাড়িঘর ও কয়েকশত একর ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

ঢুষরাইল ও হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের অধিকাংশ পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে অন্যত্র বসতি গড়েছে। এসব গ্রামে হুমকির মুখে রয়েছে অন্তত ২০০ পরিবারের বসতবাড়ি। এ ছাড়া এসব এলাকায় কবরস্থান, সড়ক, হাটবাজার ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে হুমকিতে।

কয়েকশ পরিবার বসতঘর সরিয়ে নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ সরিয়ে নিচ্ছেন। রাক্ষুসে মধুমতি বসতঘরের দুই থেকে তিন হাত দূরে ফুঁসছে। বসতভিটার গাছপালা পানির দরে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ব্যাপারিদের গাছ কাটতে দেখা গেছে। এসব এলাকার দরিদ্র লোকজনের চুলায় হাড়ি জ্বলছে না। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ রয়েছে।

চোখের পানি মুছতে মুছতে ঢুষরাইল গ্রামের নূরুল ইসলাম বলেন, ‘এ নিয়ে চারবার নদীতে বাড়ি ভাঙল। সবশেষ কয়েক দিন আগে আমার পাকা বাড়িটি মধুমতি নদী গিলে খেয়েছে। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি পথের ফকির।’

স্থানীয় লোকজনের তথ্যমতে, পাঁচদিন ধরে এ এলাকায় ভাঙন অব্যাহত আছে। দুই দিনে তা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বর্ষা শেষে ঢুষরাইল ও হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের শাহীদা বেগম, মনোয়ার হোসেন, ওলিয়ার মোল্যা, হালিমা বেগম, সুলতান মোল্যা, নূরুল ইসলাম, শাহাদত হোসেন, রমজান আলী ও মাহফুজার রহমান শেখসহ অন্তত ৪০টি পরিবারের বসতবাড়ি গ্রাস করেছে মধুমতী।

ঢুষরাইল গ্রামের রমজান আলী শেখের প্রায় তিন একর ফসলি জমি ছিল। পুরোটা নদীতে চলে গেছে। তার প্রায় এক একরের ওপর ছিল বসতবাড়ি। সেখানে তিনি আম ও লিচুর বাগান করেছিলেন। তা নদীতে বিলীন হয়েছে। এ নিয়ে তিনবার নদীতে ভেঙেছে তাদের বাড়ি। তিনি এখন নিঃস্ব।

হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের সাবেক স্কুল শিক্ষক মনোয়ার হোসেন জানান, ভাঙনরোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় নদীতে এলাকা বিলীন হচ্ছে। বিধবা শাহীদা বেগম (৭০) কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তার স্বামী নেই। বসতবাড়ির অর্ধেক নদীতে চলে গেছে। এখন তিনি কোথায় যাবেন জানেন না।

অলিয়ার রহমান মোল্যা বলেন, বাড়ি এই নিয়ে তিনবার সরানো হলো। ভেঙে যাওয়ার আগে বনজ ফলদসহ ৩০টি গাছ পানির দামে বিক্রি করেছেন। শিশু আবদুল্লাহ (১২) স্থানীয় স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সে জানায়, বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ায় তার পড়ালেখা বন্ধ। বইখাতার খবর নেই। এখন স্কুলেও যাই না।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাগুরার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান বলেন, বর্ষা শেষে অসময়ে মধুমতি পাড়ের দুটি গ্রামে তীব্র ভাঙন দেখা দিযেছে। নদীর এমন আচরণ অস্বাভাবিক। সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বস্তা ফেলার জন্য প্রকল্প পাঠানো হবে। ভাঙনরোধে এখানে স্থায়ী ব্যবস্থা দরকার। এ জন্য ডিপিপি তৈরি করে পাঠানো হবে।

আরও পড়ুন...