সেই রুহুলের নির্যাতনের আরও কাহিনী

মোটরসাইকেল হাতিয়ে নিয়ে মাদক ব্যবসা

ইউসুফ আলী সুমন, মহাদেবপুর (নওগাঁ): নওগাঁর মহাদেবপুরের আলোচিত যুবদল নেতা টর্চার রুহুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও তার দুই স্ত্রী গ্রেফতারের পর তার নানান কুকীর্তি, সন্ত্রাস, অসামাজিক কাজ, মাদক কারবার, তার সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার কাহিনী প্রভৃতি ফাঁস হচ্ছে। তার নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগীরা প্রতিকারের আশায় সাংবাদিকদের ঘটনাগুলো অবহিত করছেন। রুহুলের টর্চারের ভয়ে এতদিন যারা মুখ খুলতে সাহস পাননি, এখন তারা সেসব অন্যায়ের বিচার দাবি করছেন।

তারা জানান, রুহুলের বয়লারে প্রায়ই মাদক ও গ্রুপসেক্সের আসর বসতো। ওই আসরে নামী দামী অনেকেই যোগ দিতেন। সেখানে অনেককেই জিম্মি করে তার সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া হতো। প্রতিবাদ করলেই তাকে যেতে হতো টর্চার সেলে। যুবদলের সদস্য হলেও ভিন্নদলের প্রভাবশালীদের সাথে ছিল তার দহরম মহরম। তার দলের সাথে মিলেনা এমন কয়েকজন প্রভাবশালীর সাথে তার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মূলত: তাদের সাথে মাদক ও নারী ঘটিত বিষয়গুলো নিয়ে ছিল বন্ধুত্ব।

রুহুলের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সব কিছুই থানা পুলিশের জানা ছিল বলে বিশ^স্ত সূত্র জানায়। কিন্তু প্রভাবশালীদের তৎপরতায় এতদিন পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এমনকি মিঠুন-শ্যামলী দম্পতিকে টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করার পর মোবাইলফোনে একজন প্রভাবশালীর তৎপরতায় পুলিশ থেমে যায় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পর রুহুলের টর্চার সেলের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রভাবশালীরা নিজেরা বাঁচতে রুহুলের উপর থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করেন। ফলে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সম্ভব হয়। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালীও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

উপজেলার চেরাগপুর ইউনিয়নের পদ্মপুকুর গ্রামের মোসলেম উদ্দিন সরদারের ছেলে হাসিবুল সরদার (৪৮) অভিযোগ করেন যে, তিনি গত বছর ৭ নভেম্বর রুহুলের টর্চারের শিকার হন। বন্ধুত্বের জের ধরে সেবছর ৪ নভেম্বর সকালে তিনি তার ব্যবহৃত বাজাজ ডিসকোভার-১১০ সিসি মোটরসাইকেল রুহুলের বয়লারের গ্যারেজে রেখে রুহুলের সাথে তার কারযোগে নওগাঁয় দাঁতের ডাক্তারের কাছে যান। ফিরে এসে দেখেন গ্যারেজে অন্য কয়েকটি মোটরসাইকেল থোকলেও হাসিবুলেরটি উধাও হয়েছে। তার গ্যারেজ থেকে মোটরসাইকেল চুরির বিষয়ে মামলা দায়ের করলে তার সম্মানহানি হবে এই অযুহাতে রুহুল মামলা দায়ের করা থেকে হাসিবুলকে বিরত রাখে। তাকে অনুরুপ একটি মোটরসাইকেল কিনে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়। দুদিন পর ভোর ৪টায় তার মোটরসাইকেলের খোঁজ পাওয়া গেছে জানিয়ে রুহুল হাসিবুলকে তার বয়লারে ডেকে নিয়ে মোটরসাইকেলের খোঁজ দেয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা দাবি করে। হাসিবুল ৭ নভেম্বর সকালে টাকাসহ রুহুলের কাছে গিয়ে মোটরসাইকেল ফেরৎ চাইলে তাকে আটক করে বয়লারের পাশের গোডাউনে টর্চার সেলে নিয়ে গিয়ে রুহুল নিজে, নজিপুরের তরিকুল ও নাটশালের শাকিল হাসিবুলকে লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। এতে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে তাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা হুমকি দিয়ে বিদায় করা হয়। তাদের প্রহারে হাসিবুলের দুই হাত ভেঙ্গে যায়। দীর্ঘদিন নওগাঁ, রাজশাহী ও গ্রাম্য কবিরাজের কাছে ঝাপ বেঁধে তিনি চিকিৎসা করান। গত ১০ মাস ধরে তিনি বিভিন্ন স্থানে তার মোটরসাইকেলের খোঁজ করে আসছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি জানতে পারেন যে, তার মোটরসাইকেলটি রুহুলের মাদক সিন্ডিকেটের সদস্যরা ব্যবহার করছে। গত ২৬ জুলাই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য উপজেলার লক্ষণপুর গ্রামের মোসলেম উদ্দিন তার মোটরসাইকেলযোগে ভারত সীমান্ত থেকে মাদক পাচারের সময় জেলার ধামইরহাট থানা পুলিশের হাতে আটক হয়। তার মোটরসাইকেলের স্টিকারে ১১০ সিসির লেখা উঠিয়ে ১২৫ সিসি লেখা হয়েছে। আটক মোসলেম এলাকার চিহ্নিত মাদক সম্রাট। তার বিরুদ্ধে জেলার বিভিন্ন থানায় ৬টি মাদক মামলা রয়েছে বলে থানা পুলিশ জানায়। নির্যাতিত হাসিবুল এব্যাপারে মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে মহাদেবপুর থানায় অভিযোগ দিতে গেলে পুলিশ তার অভিযোগ নিতে অস্বীকার করে।

জানতে চাইলে মহাদেবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আজম উদ্দিন মাহমুদ জানান, ধামইরহাট থানার ওসির সাথে কথা বলে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এদিকে রুহুলের দুই স্ত্রী বৃষ্টি ও মুক্তাকে নওগাঁ কোর্টে চালান দেয়া হলে বিচারক তাদেরকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন। মামলা দায়েরের তিন দিনেও পুলিশ অভিযুক্ত রুহুকে আটক করতে পারেনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শামীনুল ইসলাম জানান, রুহুলকে আটকের ব্যাপারে পুলিশ ব্যপক তৎপর রয়েছে। তার বয়লারে মাদকের আসরে অংশ নেয়া রাঘব বোয়ালদের নামও তাদের কাছে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।

আরও পড়ুন...