যুক্তরাষ্টের নির্বাচন,জয়-পরাজয় এবং উৎকন্ঠা

অলোক আচার্য: ভোট গ্রহণ শেষ। ফলাফলও পাওয়া গেছে। তবে উৎকন্ঠা কাটেনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। প্রতিপক্ষের বিজয় মেনে নিতে পারছেন না ট্রাম্প। পরিস্থিতি কি ক্রমশই জটিল হচ্ছে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছে। শেষ পর্যন্ত এর সমাধান আইনি পথেই হতে পারে। এখনো ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও কিছুদিন দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী ২০ জানুয়ারী ক্ষমতা ছাড়বেন ট্রাম্প। নির্বাচনের পর পরাজয় মেনে নেওয়া এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করাই ছিল কাঙ্খিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম কিছুর আভাস পাওয়া যায়নি। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতা শুভ নয়। বিভিন্নভাবে তা অস্থিরতার কারণ হতে পারে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনে ভোট কারচুপির বা জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন। একটি নির্বাচন, দৃষ্টি ছিল সারা বিশে^র। আগ্রহ ছিল, অপেক্ষা ছিল আবার উৎকন্ঠাও ছিল।

নির্বাচনটা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারের হয় তাহলে দৃষ্টি সেদিকে থাকারই কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশে^র অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্রের দেশ। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভোট জালিয়াতি নিয়ে ক্রমাগত অসত্য বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রয়টার্স/ইপসোসের জরিপে এক তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র্রে ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে ৩ নভেম্বর নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন। জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি রিপাবলিকান সমর্থকও মনে করে, ট্রাম্প নয়; জয়ী হয়েছেন বাইডেনই। গত বুধবার এ জরিপ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। জয়ের জন্য ২৭০ ইলেক্টোরাল কলেজ ভোটের প্রয়োজন হয়। বাইডেন ইতিমধ্যেই এ সংখ্যার বেশি সংখ্যক ভোট পেয়েছেন। স্পষ্ট ব্যবধানে বিজয়ী হলেও এ ফল এখনো মেনে নেননি রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এখানেই জটিলতা তৈরি হচ্ছে। জো বাইডেন, একজন শান্ত,ধৈর্যশীল রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত। তিনি ফলাফলের শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন। অপেক্ষা করেছিলেন প্রতিটি ভোট গনণা হওয়ার। মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টও তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রেসিডেন্টও তিনি। জো বাইডেন আত্নবিশ^াস সম্পন্ন একজন মানুষ। যে নিজের সন্তান মারা যাওয়ার পর থেমে না গিয়ে সামনে এগিয়ে চলেছেন। তার বাবার একটি কথা তাকে অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি বলেছিলেন, তোমাকে কে কতবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল সেটি বড় কথা নয়। তুমি কত দ্রুত উঠে দাঁড়াতে পেরেছো সেটাই তোমার সাফল্যের পরিচায়ক। এজন্যই তিনি দুই বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হতে না পারা, তারপর ২০১৫ সালে সন্তানের মৃত্যু এবং এবছর আরেক জনপ্রিয় প্রার্থী বার্নি স্যান্ডাসের সাথে প্রাইমারিতে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চুড়ান্ত প্রার্থী হওয়া। এসব কিছুই তার চরিত্রের দৃঢ়তা নির্দেশ করে। তিনি বলেছেন, আমরা প্রতিপক্ষ কিন্তু শত্রু নই। রাজনীতি মানে তো সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়া। শুদ্ধ রাজনীতি এটাই নির্দেশ করে।

ট্রাম্পের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে তা অনুমেয়ই ছিল। নির্বাচনী যুদ্ধ ছিল তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। ট্রাম্পের অভিযোগ আর বাইডেনের অপেক্ষা। নির্বাচনের ফল প্রকাশে বিলম্বের সাথে সাথে কয়েকটি রাজ্যে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। নির্বাচন নিয়ে একের পর এক অভিযোগ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্পের সেসব অভিযোগ শেষ পর্যন্ত টেকেনি। করোনা মার্কিন রাজনীতিতে একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তা বাইডেনের বিজয়ের পর ভালো ভাবেই টের পাওয়া গেছে। করোনা নিয়ে ট্রাম্পের প্রথম থেকে মন্তব্য সবসময়ই সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সারা বিশ^ যেখানে মাস্কের ব্যবহারের কথা বলছে সেখানেও ট্রাম্পের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তার সাম্প্রদায়িক এবং বর্ণবাদ মনোভাবও তার জন্য বিপরীত ফল বয়ে এনেছে বলা হচ্ছে। নিজে করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরও সমালোচনা পিছু ছাড়েনি। অবশ্য ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প বিশে^র দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নেয়। মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন- স্লোগানে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প আসলে কতটা গ্রেট করেছে নাকি যুক্তরাষ্ট বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিশ^ থেকে সে হিসাবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেখানকার করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ এখন সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা দুই লাখ ৪৪ হাজার ছাড়িয়েছে। আক্রান্ত এক কোটিরও অনেক বেশি পেরিয়ে গেছে। সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সংখ্যা বাড়ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের জন্য এখনও বাকি থাকলেও বাইডেন করোনা সংকট নিয়ন্ত্রণে হাত দিয়েছেন। জো বাইডেন প্রথমেই করোনা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোরারোপ করেছেন। এটাই এখন প্রথম প্রায়োরিটি। করোনা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা ছাড়াও সবার জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিনের পরিকল্পনা, সবার জন্য মাস্ক বাধ্যতামূলক করা, অর্থনীতি,অভিবাসন,পররাষ্ট্রনীতি,স্বাস্থ্যসেবা,জলবায়ু ও জ¦ালানি বিচার ব্যবস্থায় সংস্কার ও কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক বিষয়ক পরিকল্পনা রয়েছে।

এক কোটি দশ লাখ নথিবিহীন অভিবাসীকে বৈধতা প্রদান, করোনা ছাড়াও জো বাইডেনের বিজয়ের কারণ তার ইস্যুগুলো জনগণকে টানতে পেরেছে। তিনি জনগণের বিশ^াস অর্জন করতে পেরেছেন। একজন রাজনীতিক যখন এটা বোঝাতে সক্ষম হবেন যে তিনি তাদের জন্য কাজ করতে চান তাহলে জনগণও তার সাথেই থাকে। করোনা নিয়ন্ত্রণে জোরদার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে জোর দেওয়া,অভিবাসী ইস্যুসহ কয়েকটি ইস্যু। যেসব ইস্যুতে ট্রাম্প গুরুত্বারোপ করেননি। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সাফল্যের মধ্যে ছিল মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। যা সত্যিকার অর্থেই প্রশংসা কুড়িয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে যে পরিবর্তন এসেছে বা আরো পরিবর্তন আসতে চলেছে তার অন্যতম কারিগর ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন মাধ্যমের করা জরিপের ফলাফলে জো বাইডেন এগিয়ে ছিল সবসময়। শেষ দিকের জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইের আভাস মিলেছিল। হয়েছেও তাই। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জরিপের ফল কাজে না আসলেও এবার আর তা হয়নি। হেরেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জরিপ নিয়ে যার বেশি মাথা ব্যথা ছিল না। ব্যলটে নেওয়া ভোটে এবার সর্বোচ্চ ভোট পরেছে। জো বাইডেন শুরু থেকেই নিজেকে ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। জো বাইডেনের সাথে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস, যিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং প্রথমবারের মতো যুক্তারাষ্ট্রের ইতিহাসে নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার একটি বড় দিক হলো সুষ্ঠু নির্বাচন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ এবং শন্তিপূর্ণভাবে এবং নিয়মতান্ত্রিকভাব ক্ষমতা হস্তান্তর করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাচনের ফল মেনে না নেওয়ার একঘেয়েমির কারণে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিসহ দেশের বিভিন্ন দিকে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। বিরাজ করে উত্তেজনা। নির্বাচনের ফল চলাকালীন সময়ই সহিংসতা দেখা দিয়েছিল। এখন যত দ্রুত বিষয়টির সমাধান হয় ততই ভালো।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন...