হাজারী পলোয়ান এবং আমাদের ভাইরাল নেতৃবৃন্দ

শতাব্দী আলম: কৃষক বাড়ির আঙিনায় বসে মাছি মারে। হলো কি ! একদিন গিন্নিকে শুনিয়ে বললো, ‘গুণে গুণে হাজারটা মাছি মারলাম তবুও মাছির জ্বালায় বাঁচি না।’ কৃষক গিন্নি পুকুর ঘাটে গিয়ে সে কথা তিন কানে তুলে দিল, আর বলো না আমাগো অমুকের বাপ হাজারটা মারছে। এক কান দু কান সারা গ্রামে জানাজানি হলো অমুকে হাজারটা মারছে। পাশের গ্রাম হয়ে রাজার কানেও পৌছালো হাজারটা মারার কথা। সে কথা শুনে রাজা বেজায় খুশি। যাক এবার তবে শত্রুর মোকাবেলা করতে কোন সমস্যা হবে না। গুজবের দেশে রাজাও আজব হবে এ আর নতুন কি। তিনি কৃষককে নিমন্ত্রণ করে খুব খাতির যত্ন করলেন। বিশেষ রাজসভা ডেকে কৃষককে হাজারী পলোয়ান খেতাব দিলেন। সাথে দিলেন হাজার স্বর্ণমুদ্রা।
এতো গেলো মাছি মারার গুজবে হাজারী পলোয়ানের খেতাব আর হাজার স্বর্ণমুদ্রা উপঢৌকনের কিচ্ছা। বর্তমান কালের বাংলাদেশে গুজব নয় এক্কেবারে সাক্ষাত মৃত্যুদুত হিসাবে মশার আর্বিভাব হয়েছে। আর নগরে বন্দরে ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ হাজারী পলোয়ান সাজতে ব্যতিব্যাস্ত। তবে এই পলোয়ানগণ মশা মেরে হাত নোংড়া করতে রাজি নন। ওনাদের কেতাদুরস্ত পোশাক হাতে ইয়া বড় কামান আর গালভরা কথা। এই হাজারী পলোয়ানদের কথা সবার মুখে মুখে। তিনারা যে কোনভাবে ভাইরাল হতে পছন্দ করেন। আমি অভিবাদন জানাতে চাই ওনাদের কিছু কির্তী লিখে।
সর্ব প্রথমে গর্ব সহকারে বলতে চাই মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়ের কথা। তিনি একজন দায়িত্বশীল কর্তা হিসাবেই পরিবারের সাথে মালেশিয়া গেলেন। তাদের আমুদ আর নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনিও থাকতে চেয়েছিলেন। বেরসিক গণমাধ্যমের কারনে তা আর হলো না। রিতিমত ভাইরাল। মশার ভাইরাসের চাইতেও দ্রুত দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়লেন তিনি। তার উপর চাকুরী যাবার ভয়ও আছে। যা হোক তিনি এসে ধমক দিয়ে ওই বেরসিকদের এক হাত নিয়েছেন। ধমকে সাংবাদিকরা থামলেও মশারা নির্ভয়ে বংশ বিস্তার করেই যাচ্ছে। প্রতিদিন হাসপাতালে হাজার রোগি। তিনি কিন্তু হাজার রোগির চিকিৎসা দিয়ে হাজারী পলোয়ান খেতাব পেয়েই গেছেন।
উত্তর সিটির মেয়র মহোদয়কে অতিতে দেখেছি রাস্তায় আবর্জনা ছিটিয়ে পরিস্কারের ফটোশেসন করতে। এবার তিনি পিচ ঢালা পথে মশাকে ঝাড়– পেটা করার ফটোশেসন করেন। দীর্ঘকায় পাঞ্জাবির উপরে টি-শার্টে লেখা মশক নিধন কর্মসুচি। তিনি বরাবরের মতই ভাইরাল।
আমাদের মন্ত্রী ডঃ হাছান মাহমুদ বাতচিতে বেশ সরেস। তিনি চলচ্চিত্রের কলা কুশলীদের নিয়ে জব্বর একটা মশক নিধন মহররত অনুষ্ঠান করলেন। ভাইরাল না হয়ে কোন উপায়ই নেই।
দক্ষিণের মেয়র কিছুদিন পূর্বে ড্রেনে গুতুম মাছ ছেড়েছেন। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। এই মাছের দায়িত্ব ছিল মশার ডিম খাওয়া। যেভাবে মশা বেড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই মশার সংঘ্যবদ্ধ ষড়যন্ত্রে মাছ পালিয়েছে যে কারনে মশারা নির্বাধায় বংশ বিস্তার করেছে। তিনিও বেশ সুযোগের স্বদ ব্যবহারের আশায় এবার মশার সাথে কুস্তি লড়ে যাচ্ছেন। পলোয়ান না হোক অন্তত রাজনীতির মাঠে বলিয়ান তা জোড়েসোড়ে জানান দিচ্ছেন।
রাজধানীর বাইরে সারাদেশে মশক নিধন ফটোশেষন প্রতিযোগীতা। এর জন্য রীতিমত রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্ভোদন করা চলছে। জন সচেতনতার সৃষ্টির নামে চলছে জন বিরক্তির বালখিল্যতা।
নারায়নগঞ্জে মান্যবর শামিম উসমান সুযোগ বুঝে মেয়র আইভির উদ্দেশ্যে যুতসই একটা উপমা দিয়েছেন। তিনি জনগণকে স্মরণ করিয়েছেন নমরুদ পর্যুদস্ত হয়েছে মশার আক্রমনে। তিনি হয়ত বুঝাতে চেয়েছেন মশার আক্রমনে এবার আইভির পালা।
গাজীপুর সিটিতে মেয়র মহোদয় বেশ ঘটা করে মশক নিধন ও গণসচেতনতা র‌্যালি করলেন। জন সচেতন কতটুকু হলো জানি না। তবে মশা মশাইরা বেশ সচেতন হয়েছে। কারন যেদিন র‌্যালি হয় সেদিন বঙ্গতাজ হাসপাতালে রোগি ছিল ১২ জন। এখন সেখানে শতাধিক রোগি ভর্তি।
এইভাবে লিখতে গেলে কিচ্ছার শেষ হবে না। আমরা স্বাধীন জাতি। যেহেতু স্বাধীন যা খুশি তাই করতে পারি। কে কি বললো তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। আমাদের নেতৃবৃন্দের এমনই মনোভাব। কার্যকর পদক্ষেপ বা গণমুখি চিন্তার বড় অভাব। নগর পিতাগণ সারা বছর মশক নিধন বা উন্নয়নের নামে লুটপাট করেছেন। এবার মশা তাদের প্রতি আক্রমনে পর্যুদস্ত করেছে। ভাবমুর্তি ধুলায় মেশাল। প্রকৃতি বড়ই নিষ্ঠুর। খোদা আমাদের প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং এসব ভাইরাল নেতৃবৃন্দের হাত থেকে রক্ষা করুন।

পিবিএ/বাখ

আরও পড়ুন...