হিন্দু জাতীয়তাবাদ কাশ্মীরকে না ফেরার পথে ঠেলে দিয়েছে

পিবিএ ডেস্ক: যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক ও সমকালীন রাজনীতির অধ্যাপক সুমন্ত্র বোস। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলে ভারত সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেটা অসংখ্য ভুলে ভরা এবং এর মাধ্যমে কাশ্মীরে শান্তি ফেরার সকল সম্ভাবনা রহিত হয়েছে বলেই মনে করেন তিনি। গত মঙ্গলবার বিবিসিতে প্রফেসর বোসের কলাম প্রকাশ করা হয়।

বোস বলছেন, অক্টোবরের শেষেই জম্মু-কাশ্মীর স্বশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা হারিয়ে ভারতের একটি রাজ্যে পরিণত হবে। গত সপ্তাহে ভারতীয় পার্লামেন্ট বড় ভোটের ব্যবধানে রাজ্যটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যার মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ আলাদা দুই রাজ্য হতে চলেছে। সাধারণভাবে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলো অনেক কম অধিকার সংরক্ষণ করে। যার তুলনায় রাজ্য বরং অনেক ভালো। কিন্তু, এখন রাজ্যদুটির সকল সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার কেন্দ্র নিজহাতে রাখলো।

নতুন রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরেই রয়েছে মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ। এই রাজ্যের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীর উপত্যকায় জনসংখ্যা ৮০ লাখ। অন্যদিকে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মুর জনসংখ্যা ৬০ লাখ। অন্যদিকে পার্বত্য অঞ্চল লাদাখের মোট জনসংখ্যা মাত্র ৩ লাখ। সেখানে বৌদ্ধ এবং মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় সমান সমান।

গত সপ্তাহের ঘটনাবলি হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পুরণ করেছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই তারা এই পরিবর্তন কামনা করে আসছিলো। গত সাত দশক ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সংবিধানের ৩৭০ ধারাকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য কাশ্মীরকে অত্তিরিক্ত সন্তুষ্ট করার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের ৩৭০ ধারা অস্বীকার করার এই ভাবনা তাদের এক ধর্ম এক জাতি আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত। তারা চায়, একটি অবিভক্ত এবং কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা। যেখানে সংখ্যাগুরু ভিন্ন অন্যদের মতামত, দর্শনের কোন মূল্য থাকবেনা। জম্মু-কাশ্মীরের পুনঃগঠন তাদের এই আদর্শের বুনিয়াদকে তুলে ধরেছে।

২০০২ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রধানতম সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসংঘ (আরএসএস) প্রথম জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে তিনভাগে ভাগ করার দাবি জানায়। সেখানে হিন্দু এবং মুসলিম সংখ্যার ভিত্তিতে জম্মু এবং কাশ্মীরকে আলাদা রাজ্য করার কথা বলা হয়। আর লাদাখকে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা দেয়ার দাবী করা হয়।

একইসময়, আরএসএসের আরেক সহযোগী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাজ্যটিকে চারভাগে ভাগ করার আহব্বান জানায়। যার আওতায় জম্মু এবং লাদাখ দুয়ে মিলে এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হবে। এই পরিকল্পনার আওতায় ছিলো কাশ্মীর উপত্যকার একটি বৃহৎ অংশ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রাখার প্রস্তাব। অন্যদিকে কাশ্মীর উপত্যকায় ১৯৯০-এর দশকে যে সামান্য সংখ্যক কাশ্মীরি পন্ডিত বসবাস করতেন, তাদেরকে ফের সেখানে পুনর্বাসন করা হবে এবং সেখানে শুধু তারাই থাকবেন। ভিএইচপি পরিকল্পনা অনুসারে এরপরে কাশ্মীরের যা থাকবে শুধু সেখানেই সংখ্যাগুরু মুসলিমরা বসবাস করবে। এই ধরণের পরিকল্পনা গণহত্যা এবং দখলদারিত্বের পূর্ব নকশা মাত্র।

এরসঙ্গে বিশেষ মর্যাদাই কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দিয়েছে মোদী এবং অমিত শাহের এমন যুক্তির কোন স্বতন্ত্র পার্থক্য নেই।
জম্মু ও কাশ্মীরে ১৯৯০-এর বিচ্ছিন্নতাবাদ চাঙ্গা হওয়ার প্রধান কারণ ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের চাপে তৎকালীন সরকার বিশেষ মর্যাদা আগ্রাহ্য করার প্রক্রিয়া চালিয়েছিলো।

এবং যেভাবে নিপীড়ক আইন এবং সামরিক বর্বরতায় সেখানে এই প্রক্রিয়া কার্যকর করা হয়, তা বিপুল জনরোষের জন্ম দেয়। একইসঙ্গে, নয়াদিল্লী কাশ্মীরের জনমতকে উপেক্ষা করে যেসব পুতুল সরকার স্থাপন করে, সেটাও বিচ্ছন্নতাবাদকে উস্কে দেয়। অর্থাৎ, অন্যায়ের মাধ্যমেই আরো বড় অন্যায়কে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে আজকের ভারত সরকার।

পিবিএ/এমএসএম

আরও পড়ুন...

ঘরে বসেই নিজের বিকাশ একাউন্ট খুলুন